ঝুলে আছে রিজার্ভ চুরি মামলার চার্জশিট

লেখক:
প্রকাশ: ১৫ ঘন্টা আগে

প্রায় ১১ বছর আগে ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের ফেডারেল রিজার্ভ অ্যাকাউন্ট থেকে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে ৮ কোটি ১০ লাখ ১৬২৩ মার্কিন ডলার অর্থাৎ ১০১ মিলিয়ন হ্যাক করে লুটের ঘটনা ঘটে। পরে এ ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমান।

বিষয়টি জানাজানি হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই বছরের ১৫ মার্চ মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মতিঝিল থানায় মামলা করে। এরপর ওই মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত শুরু করে। বর্তমানে স্বরাষ্ট্র এবং আইন মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে সিআইডি ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বয়ে ছয় সদস্যের একটি টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করা হয়। এখন মামলাটির তদন্ত কাজ শেষ হলেও আইনি মতামতের জন্য আটকে আছে চার্জশিট। সূত্র বলছে, রিজার্ভ চুরির ঘটনা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হওয়া মামলার রায়ের পর ওই প্রতিবেদন সিআইডিকে দিতে বলা হয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত কমিটির পরামর্শে রিজার্ভ চুরি মামলার চার্জশিটের বিষয়ে আইনি মতামত চেয়ে গত ২৯ জানুয়ারি অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে চিঠি দেন সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আল-মামুন। এদিকে কারও নাম উল্লেখ না করে ফৌজদারি দণ্ডবিধির ১৭৯ (চুরির অপরাধ) ধারাসহ ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং আইনের ৪ ধারা এবং ২০০৬ সালের আইসিটি আইনের ৫৪ ধারায় মামলাটি করা হয়। যা ছিল হ্যাকিং ও রিজার্ভ লুটের ঘটনায় বড় ধরনের ঘাটতি। সূত্র জানায়, গত বছরের ৭ জানুয়ারি মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব চেয়ে সিআইডিকে চিঠি দেয় দুদক। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তদন্তভার হস্তান্তরে রাজি হয়নি। জানতে চাইলে মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা আল মামুন এ প্রতিবেদককে জানান, এখনো তিনি আইনি মতামত পাননি। তবে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম প্রায় সম্পন্ন। নানান তথ্য-উপাত্ত বিভিন্ন দেশ থেকেও সংগ্রহ করেছেন তিনি। জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের জন্য ব্যবহৃত সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন (এসডব্লিউআইএফটি) সার্ভার অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি সিস্টেম। তারপরও তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমান ওই সার্ভারের সঙ্গে রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) সিস্টেম সংযুক্ত করার অনুমোদন দিয়েছিলেন। তদন্তকারীরা এ সিদ্ধান্তকে অপরাধমূলক বলে চিহ্নিত করেন। আরটিজিএস এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর মধ্যে তাৎক্ষণিক অর্থ স্থানান্তর করা সম্ভব হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক শুভংকর সাহার মধ্যস্থতায় হ্যাকিংয়ের প্রথম অধ্যায়ে আরটিজিএস প্রকল্প আনা হয়। হ্যাকারদের হাতে তুলে দেওয়া হয় সুইফটের এক্সেস। পরিকল্পনামতো আরটিজিএস সংযোগ স্থাপনের জন্য ভারতীয় নাগরিক নীলা ভান্নানকে ভাড়া করে বাংলাদেশ ব্যাংকে নিয়ে আসেন আতিউর। আরটিজিএস স্থাপনের পর নীলা ভান্নান বাংলাদেশ ব্যাংকের ইন্টারনেটের সঙ্গে সুইফটের সংযোগ স্থাপন করে দেন।

হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে রিজার্ভ চুরির ঘটনার পর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই আংশিক (ছায়া) তদন্ত করেছিল। তারা জানিয়েছিলেন, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এত বড় হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটেছে। রিজার্ভ হ্যাকিংয়ের ঘটনা তদন্তে রাষ্ট্র সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিনকে দিয়ে তদন্ত করায়। ওই তদন্ত প্রতিবেদন ২০১৮ সালের ২০ মার্চ জমা দেওয়া হয়। কিন্তু তা প্রকাশ করা হয়নি।

সিআইডি সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে সিআইডি ফরেনসিক ল্যাবে মামলাটির আলামত পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরীক্ষায় হ্যাকিং প্রমাণিত হওয়ার ৬৩৭ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দেয় ফরেনসিক বিভাগ। তদন্ত করতে গিয়ে সিআইডি মামলার ত্রুটিবিচ্যুতি লক্ষ করে। তারা দেখতে পান, আর্থিকভাবে সুবিধা পেতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে সিন্ডিকেট সুইফটের সঙ্গে আরটিজিএসের সংযোগ স্থাপনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক দুর্বৃত্ত ও হ্যাকারদের সঙ্গে অনেক দিন ধরে যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন।